Logo

চট্টগ্রামের অবৈধ দখলের রেলের বস্তিগুলো মাদকের আস্তানা রেল কর্তৃপক্ষের নিরব ভূমিকা

রিপোর্টার:
আপডেট : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২০

ডেস্ক রিপোর্ট

চট্টগ্রামে রেলের শতকোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে গড়ে উঠা বস্তি গুলো এখন মাদকের আস্তানা । পাহাড়তলী আমবাগান রেল লাইন ঘেঁষে সরকারি এসব সম্পত্তি দখলের মহোৎসব চললেও রেলের কর্তারা যেন না দেখার অভিনয়ে ঘুমিয়ে রয়েছেন। আর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে খোদ রেলে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের সরকারি বরাদ্দ বাসার আংশিক বাড়তি স্থাপনাটুকু। রেহায় পাচ্ছে না বাসার সামনের পরিত্যক্ত জায়গায় শখের বাগানও। অথচ আঁচড়ও পড়ছে না মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত আমবাগানের মন্টু, সোনিয়ার মা ও মাসুদের বস্তির অবৈধ কলোনির শত কোটি টাকার সম্পত্তি।

প্রতিমাসে এসব কলোনির অন্তত ২৫০ ভাড়াঘর থেকে আয় হয় ১৫ লাখ টাকারও বেশি। এই টাকার বিশেষ অংশ যাচ্ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৮ কর্মকর্তার পকেটে। এর মধ্যে রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগেই সবচে বেশি মাসোহারা দিতে হয়। বাদ যায় না রেলের বিদ্যুতের কর্মকর্তা কমচারীরাও

একের পর এক অভিযানে উচ্ছেদ অভিযানেও অক্ষত আমবাগানের মন্টু, সোনিয়ার মা ও মাসুদের বস্তির অবৈধ কলোনি যেন একেকটি গল্প। চট্টগ্রাম শহরের অপরাধজগতের এসব গোপন আস্তানা সন্ধ্যার পরই বদলে যায়। দিনের আলোর গড়িয়ে গোধূলিবেলার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় চেনা মুখগুলো, চেনা চেহারা।

মন্টু, সোনিয়ার মা ও মাসুদ কেউ রেলের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী না। এরা পাহাড়তলীর স্থানীয় বাসিন্দাও না। তবু এদের দাপট ও ক্ষমতার প্রভাব বেশ। রেলের শত কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তি দখল করে বানিয়েছে বড়বড় তিনটি বস্তি। এরমধ্যে সবচে বড় বস্তি মন্টু কলোনির। এখানে রয়েছে অন্তত ১২০টি ভাড়া ঘর। লিজও নেওয়া হয়নি। তবু বহাল যুগযুগ ধরে। একইভাবে সোনিয়ার মা ও মাসুদের বস্তিতে রয়েছে অন্তত ১৫০ স্থাপনা। এসব বস্তিতে দিনের আলোতে চলে জুয়ার আসর। আর সন্ধ্যার পরই বেড়ে যায় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা। রাত আর মধ্যরাতেও চলে মদের আসর। মাদকের আসরে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে খুলশী থানা পুলিশের কিছু পরিচিত মুখের। তবে তারা সাদা পোশাকেই আসেন। কখনো কখনো আসেন গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। আসে রেলের অনেক ‘দাপুটে’ নেতাও। বাদ নেই কেউ। তাই উচ্ছেদ অভিযানেও আঁচড় পড়ে না এসব বস্তিতে—এসব কথাগুলো জানালো স্থানীয়রা।

উচ্ছেদ অভিযানের নামে নাটক
রেলের সবশেষ অভিযানের মন্টু অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করতে গিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মিন্টু নামে এক রেল কর্মকর্তার বাসার বাড়তি অংশবিশেষসহ তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাসা। মিন্টু আর মন্টু। দুইজনের নামে কিছুটা মিল থাকলেও মিন্টু কাজ করেন রেলওয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পদে। আর মন্টু একজন গ্যারেজ মিস্ত্রি এবং অপরাধ জগতেরই একজন। তবে মন্টু গ্যারেজ মিস্ত্রি হলেও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জায়গায় তার রয়েছে দেড় শতাধিক অবৈধ বসতঘর। বসতঘর ছাড়াও মন্টুর আছে প্রায় ১০০ রিক্সাও। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, গত ১৯ অক্টোবর রেলের জায়গা দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ বসতঘর উচ্ছেদ করতে অভিযান পরিচালনা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এই অভিযানে কোন এক রহস্যজনক কারণে মন্টুর অবৈধ বসতঘর উচ্ছেদ করেনি, ছুঁয়েও দেখেনি। শুধুমাত্র নামের কিছুটা মিল থাকায় মিন্টুর সরকারি বাসার বর্ধিত অংশ উচ্ছেদ করে রেল কর্তৃপক্ষ। মন্টুর কলোনি বেশ পরিচিত বস্তি। অথচ এটি বাদ দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, শুধুমাত্র নামের কিছুটা মিল থাকায় এতবড় মন্টু কলোনি বাদ দিয়ে উল্টো মিন্টুর সরকারি বাসার কিছু অংশ গুড়িয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এটিকে কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেকে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃক্ষপকে আরও বেশি দক্ষতায় পরিচয় দিতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের ধারণা মন্টুর এই কলোনিতে রেলওয়ের সম্পত্তির মূল্য শতকোটি টাকা হতে পারে।

সোমবার (২৫ অক্টোবর) খুলশীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ আমবাগান এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ওই এলাকায় বেশকিছু অবৈধ স্থপনা উচ্ছেদ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে বৈধ হলেও এই উচ্ছেদ অভিযান থেকে রেহাই পাইনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কর্মচারী মিন্টু, স্টেশন মাস্টার মিঠু ও আব্বাসের সরকারি বরাদ্দকৃত স্থাপনাও। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব স্থাপনাসহ বেশকিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করলেও বরাবরের মতো এবারও অক্ষত রয়েছে মন্টু কলোনি, সোনিয়ার মার বস্তি ও মাসুদের কলোনি।

জানা গেছে, তিন কলোনির ঘরের সংখ্যা অন্তত ২৭০টিরও বেশি। এর মধ্যে মন্টুর কলোনিতে অন্তত দেড় শতাধিক। এসব কলোনিতে সন্ধ্যার পর মাদকের আসরও বসে। এছাড়া আমবাগান রেল লাইনের পাশ ঘেঁষে মাসুদ কলোনি ও সোনিয়ার মার বস্তি। তবে এ দুটির মধ্যে সোনিয়ার মার বস্তি মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত বেশ।

ছিদ্দিকুর রহমান নামের এক অবসরপ্রাপ্ত রেল কর্মচারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে এখানে অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নামের ভুলের কারণে মন্টুর বস্তি উচ্ছেদ না করে রেলওয়ে কর্মকর্তা মিন্টুর বাসার বাড়তি অংশ গুড়িয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, তিন কলোনির ঘরের সংখ্যা অন্তত ২৭০টিরও বেশি। এর মধ্যে মন্টুর কলোনিতে অন্তত দেড় শতাধিক। এসব কলোনিতে সন্ধ্যার পর মাদকের আসরও বসে। এছাড়া আমবাগান রেল লাইনের পাশ ঘেঁষে মাসুদ কলোনি ও সোনিয়ার মার বস্তি। তবে এ দুটির মধ্যে সোনিয়ার মার বস্তি মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত বেশ।

ছিদ্দিকুর রহমান নামের এক অবসরপ্রাপ্ত রেল কর্মচারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে এখানে অনেক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নামের ভুলের কারণে মন্টুর বস্তি উচ্ছেদ না করে রেলওয়ে কর্মকর্তা মিন্টুর বাসার বাড়তি অংশ গুড়িয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, রেলের কোন অভিযানেও উচ্ছেদ হয় না পাহাড়তলী আমবাগানের মন্টু কলোনি, সোনিয়ার মার বস্তি ও মাসুদ কলোনির অবৈধ বস্তি। এসব স্থাপনায় রয়েছে অবৈধ বিদ্যুত সংযোগও। বিদ্যুৎ চুরিতে জড়িত রয়েছে রেলওয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন ও পিডিবির কর্মকর্তা কর্মচারীরা। রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের এসব বস্তির নিয়ন্ত্রকরাও জার্সি বদলে নেয় রাতারাতি। আর ক্ষমতা ও মাসোহারায় ম্যানেজ করে ঠেকিয়ে দেওয়া হয় উচ্ছেদ অভিযান।

স্থানীয়রা জানাম, মাদকের বড় আখড়া মন্টু কলোনির নিয়ন্ত্রক মন্টুর ছেলে নরুন্নবীও রেলের লোহা চোরচক্রের অন্যতম সদস্য। তার বিরুদ্ধে খুলশী থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে।

উচ্ছেদের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রেলওয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিন আহমেদ মিন্টু চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আমার ছেলে-মেয়েরা স্কুল কলেজ পড়ুয়া। বাসাটি ছোট হওয়া তাদের লেখাপড়ার সুবিধায় কয়েকটি রুম তৈরি করেছি। কিছু একটি চিহ্নিত মহল আমার তৈরি করা রুমগুলো মন্টুর বলে প্রচার করে। এতে অভিযানকে ‘দৃশ্যমান’ করতেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া আমি বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি করায় অবৈধ বস্তি ও এর আশপাশের কিছু অবৈধ বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করেছি। এসব কারণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে হয়ত ভুল বুঝিয়ে আমার রুমগুলো উচ্ছেদ করেছে।

মন্টুর বস্তি উচ্ছেদ না করে মিন্টুর বৈধ স্থাপনা কেন উচ্ছেদ করা হলো এমন প্রশ্নে বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মাহবুব উল করিম বলেন, বিষয়টি আমি যাচাই করে দেখবো। তবে আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সর্দার শাহাদাত আলী বলেন, বিষয়টি আমার কানেও এসেছে। তথ্যগত ভুলের কারণে এ ধরনের কিছু হলে অবশ্যই পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর দেখুন