Logo

আমাকে ওরা বন আর পানি ছাড়া কিছু খেতে দেয়নি” সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার

রিপোর্টার:
আপডেট : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২০

তুহিন: জেলা প্রতিনিধি চট্রগ্রাম।

চট্রগ্রাম সীতাকুন্ড উপজেলার বড় কুমিরা পিএইচ ঢেউটিন কারাখানা সংলগ্ন সোনার পাড়া খালের জঙ্গল থেকে মূমূর্ষ অবস্থায় সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারকে পুলিশ উদ্ধার করেছে।নগরীর ব্যাটারি গলি এলাকা থেকে ৪ দিন আগে নিখোঁজ হওয়া সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার। স্থানীয় এক দোকানদার সরোয়ারকে খালে পড়ে খালি গায়ে পড়ে থাকতে দেখে আশপাশের সবাইকে ডেকে আনেন। পরে স্থানীয়রা সেখানে গেলে অজ্ঞান অবস্থাতেই বিড়বিড় করে বলতে থাকেন ‘আমি আর নিউজ করবো না, প্লিজ… আমি নিউজ আর করব না ভাই. তাছাড়া তার মুখ থেকে আর কোন কথাই বের হচ্ছিল না,শুধু উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করছিলেন তিনি।

পরে স্থানীয়দের বরাতে খবর পেয়ে এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তখন অজ্ঞান অবস্থাতেই নিজের পরিচয় দেন সাংবাদিক সরোয়ার। পরে সীতাকুণ্ড থানার ওসি এবং কোতোয়ালী থানার ওসি ঘটনাস্থলে ছুঁটে যান। সাংবাদিক সরোয়ারকে উদ্ধার করে বড় কুমিরা বাজার এলাকার ওই খালে পাড় থেকে কোতোয়ালী থানা পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এর আগে সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারের নিখোঁজ রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয় সিভয়েসের পক্ষ থেকে। তখন বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ধারণা স্থানীয় একটি নিউজ পোর্টালে গোলাম সরোয়ার খুলশীতে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে ক্যাসিনো ব্যবসার নিউজ করার কারণেই হয়তো তাকে অপহরণ করা হয়েছে। সেই ধারণা আরও পোক্ত হচ্ছিল যেদিন ওই নিউজ প্রকাশিত হয়েছে, তার পরের দিনই নিজ বাসা ব্যাটারিগলির মুখ থেকে নিখোঁজ হন তরুণ এ সাংবাদিক। ওই এলাকা থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল।

খুলশীতে প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে ক্যাসিনো ব্যাবসার নিউজ। এর পরপর ব্যাটারি গলি এলাকা থেকে হঠাৎ গায়েব হওয়া। সন্ধান মেলার পর নিউজ না করার কথা বলে বলে উচ্চস্বরে কান্নাকাটি। সবমিলিয়ে আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সরোয়ারের করা নিউজ করার খেসারত হিসেবেই হয়তো তাকে সহ্য করতে হয়েছে এ নির্মম নির্যাতন। ওই নির্যাতনের ফলে মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়েছেন তিনি।

এর আগে রোববার রাত ৮টার দিকে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা সাংবাদিক সরোয়ারকে উদ্ধারের খবর পেয়ে টিম পাঠিয়েছি। তাকে চট্টগ্রাম আনার পর তার সাথে কথা বলার পরই বিস্তারিত জানা যাবে।’

সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি অসুস্থ আছেন। তার সাথে কথা বলা সম্ভব হচ্ছেনা। তার জ্ঞান ফেরার পর কথা বলে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে নগরীর ব্যাটারি গলির বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিটিনিউজ বিডির সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার। এ ব্যাপারে তার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জুবায়ের সিদ্দিকি কোতোয়ালি থানায় একটি জিডি করেন।

নিখোঁজের দুদিন পর পরপর দুবার তাঁর মোবাইল নম্বর থেকে সহকর্মী জুবায়ের সিদ্দিকী ও কামরুল হুদার নম্বরে ফোন এলেও অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। সর্বশেষ আজ রোববার (১ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ থেকে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপরই খোঁজ মিলে সাংবাদিক গোলাম সারোয়ারের।

সোমবার (২ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারের মুখে লোমহর্ষক এমন নির্যাতনের কথা উঠে এলো। এ সময় তার দুই চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল।

সারোয়ার বলেন, আমি বার বার জিজ্ঞেস করেছি, কোন নিউজের জন্য আমাকে মারছ? কিন্তু সে নিউজের নাম তারা একবারও বলেনি। আমার পা বাধা ছিল। চোখ বন্ধ ছিল। কানেও তুলাজাতীয় বস্তু দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল। তবুও ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতাম। এই সময়ে আমাকে খেতে দিত শুধু পাউরুটি আর পানি। প্রতিটি ক্ষণ মনে হয়েছিল আমি এখনিই মারা যাবো। তারাও একে অপরকে বলছিল মেরে ফেলে দিই। কিন্তু অপরজন বলছিল মেরে ফেলা স্যারের নিষেধ আছে।

এ সময় টেলিফোনে তাদের কেউ একজনকে বলতে শুনেছি, সাংবাদিকদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাকে (আমাকে) তুলে এনেছি, হত্যার জন্য নয়। ও সাংবাদিক খবরদার ওকে হত্যা করা যাবে না। এমন কথা মোবাইলে বলতে শুনেছি।

কান্না জড়িত কন্ঠে সরোয়ার বলেন, তারা ঘণ্টায় ঘণ্টায় আমাকে পেটাতো। টর্চার সেলে লোক ছিল ৫ জন। এদের মধ্যে তিনজন ঢাকার ভাষায় কথা বলতো। দুই জন কথা বলতো চট্টগ্রামের ভাষায়। তুলে নেওয়ার দিন কিলঘুষিও মেরেছিল। কিন্তু বৃহ¯পতিবার সকাল থেকে শুরু হয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় নির্যাতন। নির্যাতনের ফাঁকে ফাঁকে শুধু একটি কথায় বলতো নিউজ করবি কিনা বল। নির্যাতনকারীরা এমন কথাও বলেছে তাকে যে, এখন সাংবাদিকদের কোনো বেইল (গুরুত্ব) নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর দেখুন